মাকসুদুল বারী: আলো ও ফ্রেমের এক বহুমাত্রিক শিল্পযাত্রা

বাংলাদেশের আলোকচিত্র ও সিনেমাটোগ্রাফির ইতিহাসে কিছু নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়—তাদের মধ্যে অন্যতম মাকসুদুল বারী। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী একাধারে আলোকচিত্রী, চিত্রগ্রাহক, স্থিরচিত্রগ্রাহক, শিক্ষক এবং সংগঠক। তার পরিচয় একটিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি যেন একটি পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল স্কুল, যেখানে ফটোগ্রাফি ও সিনেমা একসাথে মিশে গেছে অভিজ্ঞতা ও দর্শনে।

বাংলাদেশে একই সঙ্গে আলোকচিত্রী ও সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে দক্ষতা ও সুনাম অর্জন করেছেন—এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এই বিরল তালিকায় আনোয়ার হোসেন, মাকসুদুল বারী, শফিকুল ইসলাম স্বপন, খালিদ মাহমুদ মিঠু, মিশুক মুনীর থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের রাশেদ জামান—সবাই নিজ নিজ জায়গায় অনন্য। তবে মাকসুদুল বারীর কাজের ব্যাপ্তি ও গভীরতা তাকে এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মাকসুদুল বারীর ফটোগ্রাফি যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। একই বছর তিনি বেগার্ট থেকে ফটোগ্রাফির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেই সময়ই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস)—যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ‘বিপিএস’ নামটিও তারই প্রস্তাবনা। ১৯৭৮ সালে তিনি আজীবন সদস্য (সদস্য নং ৬৭/৭৮) হিসেবে যুক্ত হন এই সংগঠনের সঙ্গে।

৭০ ও ৮০–এর দশকে তিনি একজন শক্তিশালী ও প্রভাবশালী আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জাপানে ইউনেস্কো আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন তার ক্যারিয়ারের একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। এশিয়ার হাজারো প্রতিযোগীর মধ্যে এই অর্জন তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।

ফটোগ্রাফির পাশাপাশি মাকসুদুল বারী চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন মাধ্যমেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি প্রায় ৫টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ৫০টিরও বেশি তথ্যচিত্র এবং প্রায় ৩৫০টি টিভি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন।

২০০৩ সালে সাইদুল আনাম টুটুল পরিচালিত ‘আধিয়ার’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে সম্মানিত হন। একইসঙ্গে তিনি এই চলচ্চিত্রে স্থিরচিত্রগ্রাহক হিসেবেও কাজ করেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে আলমগীর কবির পরিচালিত ‘পরিণীতা’ সিনেমার জন্য ‘সেরা চিত্রগ্রাহক (সাদাকালো)’ বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন।

তার কাজের বিস্তার আরও দেখা যায় ‘রানীকুঠির বাকি ইতিহাস’ (২০০৬) চলচ্চিত্রে এবং তারেক মাসুদের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’–এর কিছু অংশেও তিনি চিত্রগ্রাহক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। প্রখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মানজারে হাসিনের সঙ্গে তার দীর্ঘ কাজের সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে ১৯৯৫ সালের ‘বিল ডাকাতিয়ার বৃত্তান্ত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সূচনালগ্নের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘আগামী’–এর চিত্রগ্রাহক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন—যা তাকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ করে তুলেছে।

শুধু সৃষ্টিশীল কাজেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও মাকসুদুল বারীর অবদান গভীর। তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। এছাড়া নিমকো ও বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (বিসিটিআই)–এ শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের “আলোর ইশকুল” কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের ফটোগ্রাফি শিক্ষা দিয়েছেন—যা তার শিক্ষাদানের প্রতি ভালোবাসার আরেকটি প্রমাণ।

১৯৭৬ সালে তিনি ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে (বর্তমান FTII) সিনেমাটোগ্রাফি ও ফটোগ্রাফিতে ডিপ্লোমা করতে যান। প্রয়াত সদরুল পাশার সঙ্গে চার বছরব্যাপী (১৯৭৬–১৯৮০) এই প্রশিক্ষণ তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই বাংলাদেশের আরও অনেক খ্যাতিমান নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক গড়ে উঠেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে মাকসুদুল বারী নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি বাসাতেই সময় কাটান, তবে তার কাজ ও অবদান আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।

মাকসুদুল বারী শুধুমাত্র একজন আলোকচিত্রী বা সিনেমাটোগ্রাফার নন—তিনি বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। তার কাজের বিস্তৃতি, শিক্ষাদান এবং সংগঠক হিসেবে অবদান তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আলো, ফ্রেম এবং মানুষের গল্প—এই তিনের সংমিশ্রণে তিনি তৈরি করেছেন এক অসাধারণ শিল্পযাত্রা, যা দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রেরণা জোগাবে আগামী প্রজন্মকে।

top wedding photographerin bangladesh

Related News

Leave a Comment